ধর্ম

আজ পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা

আখেরি চাহার শোম্বা – আজ (বুধবার) পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা। মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্মারক দিবস হিসেবে হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবার পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা পালিত হয়। ১৪৪০ হিজরি সনের পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আজ ওয়াজ ও মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকবে।

ফারসি শব্দমালা আখেরি চাহার শোম্বা অর্থ শেষ চতুর্থ বুধবার। ইসলামের সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ ও বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে আখেরি চাহার শোম্বা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নবী করিম (সা.) ইন্তেকালের আগে এদিনে কিছুটা সুস্থতা বোধ করেছিলেন। তাই ফারসিতে এ দিনটিকে আখেরি চাহার শোম্বা নামে অভিহিত করা হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনে শেষবারের মতো রোগমুক্তি লাভ করেন বলে দিনটিকে মুসলমানেরা প্রতিবছর ‘শুকরিয়া দিবস’ হিসেবেও পালন করে থাকেন। তারা নফল ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে দিনটি পালন করেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন জানান, পবিত্র আখেরি চাহার শোম্বা উপলক্ষে বুধবার বাদ জোহর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ওয়াজ ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।

শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের গুরুত্ব

ভূপৃষ্ঠে নিষ্পাপ মানুষ বলতে আমরা শিশুদেরকেই জানি। কিন্তু এই শিশুরাই সমাজে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শিশুরা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। বড়দের নানা সমস্যা ও সংকটের প্রভাব সরাসরি শিশুদের ওপর পড়ে। এসব সমস্যা মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ থাকে না।

তবে সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই শিশুর জন্ম আনন্দদায়ক ঘটনা। নানা সমাজে শিশুকে নানাভাবে স্বাগত জানানো হয়। শিশুর জন্মের পর মুসলমানরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান আকিকা পালন করে। সদ্যপ্রসূত শিশুর মঙ্গলের জন্য গরু বা ছাগল জবাই করার রেওয়াজও রয়েছে। হিন্দুদের মধ্যে সামাজিক প্রথা অন্নপ্রাশন পালন করা হয়। এর বাইরেও নানা উপায়ে শিশুর জন্মকে উদযাপন করা হয়। তবে একজন মানবসন্তান ঠিক কখন থেকে শিশু হিসেবে গণ্য হবে এবং কোন বয়স পর্যন্ত শিশুর মর্যাদা পাবে তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের এক নম্বর অনুচ্ছেদে ১৮ বছরের নীচে সব মানবসন্তানকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ আইনকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো দেশের আইনে আরও কম বয়সকে শিশু বয়সের শেষ সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তাহলে সেটাকেও মেনে নেয় জাতিসংঘ।  ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘শিশু অধিকার সনদ’ গৃহীত হয়। এটি ১৯৫৯ সালে গৃহীত ১০টি অধিকার বা ধারা পরিমার্জন ও পরিবর্ধন হয়ে ১৯৮৯ সালে বিশেষ ৪টি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ৫৪টি ধারা সংবলিত এই ‘শিশু অধিকার সনদ’ গৃহীত হয়েছে।

যাইহোক ঠিক কোন সময় থেকে একজন মানবসন্তান শিশু হিসেবে গণ্য হবে তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের চিন্তা-ভাবনা, মন-মানসিকতা ও স্বভাব-চরিত্রের প্রভাব মাতৃগর্ভে থাকা শিশুর ওপরও পড়ে।

এ কারণে গর্ভবতী মায়ের জন্য নেক চিন্তা করা, কুরআন তেলাওয়াত করা, সুন্দর দৃশ্য ও সবুজ মনোরম পরিবেশ দেখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ভালো পরিবেশে বসবাস করা, সমস্ত খারাপ ধ্যান-ধারণা, খারাপ পরিবেশ থেকে নিজেকে বিরত রাখা মায়ের জন্য খুবই জরুরি।

সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুকে দুধপান করানো মায়ের অপরিহার্য নৈতিক কর্তব্য। পবিত্র কুরআনে শিশুকে মায়ের দুধপানের বিষয়ে বহু নীতিমালার উল্লেখ হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন- যে সমস্ত জননী দুধপান করানোর মেয়াদ পূর্ণ করতে চায় তারা নিজেদের সন্তানদেরকে পুরো দুই বছর দুধ পান করাবে  (সূরা বাকারা : ২৩৩)।

তবে সুরা বাকারার এই আয়াতের পরের অংশ বলা হয়েছে- যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ে পারস্পরিক পরামর্শ ও আলোচনার ভিত্তিতে দুধ ছাড়িয়ে নিতে চায়, তাহলে সেক্ষেত্রে তাদের কারো কোনো গুনাহ না।

জন্মের পরও মা-বাবার স্বভাব-চরিত্র শিশুর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতার ওপর অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য চলে আসে, যা একজন মুসলিম শিশুর ন্যায্য অধিকারও বটে। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ডান কানে আজানের শব্দগুলো এবং বাম কানে একামতের শব্দগুলো শুনানোকে ইসলাম ধর্মে সুন্নত হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে শিশু অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাহেলি যুগে শিশু হত্যা বিশেষ করে কন্যাসন্তান হত্যা তাদের অভ্যাস ছিল। মহান রাব্বুল আলামিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর পবিত্র কুরআন নাজিল করার মাধ্যমে জাহেলি যুগের শিশু হত্যার সিস্টেমকে কেয়ামত পর্যন্ত রহিত করে দিয়েছেন।

শিশুর শিক্ষাকে ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। কারণ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়ে। সুরা আলাকের প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে- পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমায় সৃষ্টি করেছেন। অর্থ্যাৎ শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তার শিক্ষা জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দিতে হবে।

ধর্মীয় পরিবেশে সঠিকভাবে শিশুর লালন-পালন করা পিতা-মাতার দায়িত্ব। ঘরে যদি দ্বীনি পরিবেশ থাকে তাহলে দ্বীনি পরিবেশের প্রভাব শিশুর মননে বিকাশ সাধন করে; ফলে দুনিয়াতে সে কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত থাকার আশঙ্কা কম থাকে। ঘরে যদি নামাজ, রোজা ও তেলাওয়াতের পরিবেশ থাকে, তাদের দেখাদেখি শিশুটিও ধর্মীয় কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। নামাজির মতো সিজদা করতে থাকে। যা দেখে মহান রাব্বুল আলামিন যারপরনাই খুশি হয়ে থাকেন। কিন্তু যদি তা না করে অন্যায় ও অশ্লীল কোনো দৃশ্য শিশুর সামনে পড়ে বা শিশুর সামনে অন্যায় কোনো আচরণ করা হয় তখন এর প্রভাব শিশুর মানসপটে পড়ে যায়। যা সে বড় হলে বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করে।

শিশুর ভালো নাম রাখা শিশুর অধিকারের মধ্যে পড়ে। কারণ শিশুর ভালো নাম তার মন ও ভবিষ্যতে ফুলের মতো জীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। শিশুকে আদব, আমল ও সুশিক্ষা দিতে হবে। শিশুকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, তাকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী এবং প্রত্যেক কাজে আল্লাহর নামে শুরু করার অভ্যাস গড়ে তোলাও শিশুর অধিকার।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সমাজে আদর্শবান শিশু না থাকলে আদশ সমাজ গড়ে উঠবে না। শিশুরা যাতে কোনো বিপদে না পড়ে তার নির্দেশনা ইসলাম ধর্মে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কেউ যদি কোনো শিশুকে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় বা বিপদশংকুল অবস্থায় দেখে, তাহলে তাকে উদ্ধার করা তার ওপর ফরজ। যদি কেউ কোনো শিশুকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দেখেও উদ্ধার করার চেষ্টা না করে, তাহলে ঐ শিশুর কোনো ক্ষতি হলে তার জন্য ঐ ব্যক্তিই দায়ী হবে। সমাজে অসহায়, এতিম শিশুদের প্রতিপালনের দায়িত্ব ঐ সমাজের বিত্তশালী মানুষের। যদি তারা অপারগ হয়, তাহলে রাষ্ট্রকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে।

আপনার মতামত