Fifa World Cup

ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপ জিতলে…

ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপ জিতলে- পৃথিবীতে ক্রোয়েশিয়া ছাড়া এমন দেশ খুব কমই আছে যেখানে রাজনীতি ও ফুটবল একে-অপরের সঙ্গে এতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত তিন দশকের ক্রোয়েশিয়ান ফুটবলের গল্পটা ছিল নাটকীয়তায় ঠাঁসা। ফুটবলাররা ছিলেন যেন দেশের সৈনিক। দেশের ফুটবল স্টেডিয়ামে যেই সহিংসতা শুরু হয়েছিল, তার পরিণতি হয়েছিল রক্তাক্ত যুদ্ধে। আবার দেশটির এই ফুটবল জগতে যেই দুর্নীতি তা-ও অবিশ্বাস্য। ফুটবল যেন ক্রোয়েশিয়ানদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে।

অথচ সেই ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল ভক্তরাই আবার অসংখ্যবার তিরস্কৃত হয়েছেন ফ্যাসিস্ট শ্লোগানের জন্য। দ্য ইকোনমিস্টের একটি নিবন্ধের সূচনা ছিল এমনই।

এতে বলা হয়, ৭ই জুলাই যেদিন রাশিয়াকে হারায় ক্রোয়েশিয়া, সেদিন সব কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভুলে রাশিয়ান প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভের সামনেই আনন্দে নাচছিলেন ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট। আবেগের বাইরে প্রেসিডেন্টের এই উল্লাশের অন্য কোনো হেতু যদি কেউ খুঁজে বের করে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ, প্রেসিডেন্ট, তার দল সহ ক্রোয়েশিয়ার সকল রাজনৈতিক দল ফুটবল-সংক্রান্ত নির্বাচনী অর্থায়ন থেকে লাভবান হয়েছে।

১৫ই জুলাই ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে ক্রোয়েশিয়া। সেদিন শুধু বিশ্বকাপ জয়ই নয়, ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে পরাজয়ের প্রতিশোধও হয়তো নিতে চাইবে ক্রোয়েশিয়া।

স্বাধীন ক্রোয়েশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঞ্জো তুদজম্যান, যিনি নব্বইয়ের দশকে যুগো¯¬াভিয়ার তিক্ত ভাঙ্গন ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘ফুটবলে বিজয় একটি দেশের আত্মপরিচয়কে ততটাই রূপায়ন করে, যতটা করে যুদ্ধ।’ এটা প্রায়ই বলা হয় যে, ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ১৯৯০ সালের মে মাসের একটি দিন থেকে, যেদিন স্থানীয় ফুটবল ক্লাব জাগরেব ও সার্বিয়ার বেলগ্রেডের ভক্তরা সহিংস সংঘাতে লিপ্ত হন। এই দাবি সত্য নয়, তবে এটি সত্য যে সেদিনের ওই সংঘাতের তাৎপর্য ছিল ভীষণ তীব্র। ওই ম্যাচের দুই সপ্তাহ পর যুগোস্লাভিয়ার জাতীয় ফুটবল দল একই স্টেডিয়ামে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে এসেছিল। সেদিন যুগোস্লাভীয়ার জাতীয় সঙ্গীত চলাকালে কেবল দুয়োধ্বনী দিয়েছিল ক্রোয়েশিয়ান সমর্থকরা।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট হন তুদজম্যান। স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৯৯১ সালে যুদ্ধে জড়িয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। তখন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন, দেশের ক্রীড়াবিদরা হলেন দেশের রাষ্ট্রদূত। বলকান রাজনীতি ও ক্রীড়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দারিও ব্রেনতিন বলেন, তুদজম্যানের স্পষ্ট দর্শন ছিল, ফুটবল ও ক্রীড়া একটি জাতির গড়ন ঠিক করে। ১৯৯৮ সালে যেদিন বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে উন্নীত হয় ক্রোয়েশিয়া, সেদিন প্রেসিডেন্ট একে স্রেফ ফুটবল দক্ষতা নয় বরং ‘ক্রোয়েশিয়ান চেতনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

তুদজম্যান মারা গেছেন আগেই। কিন্তু তার শাসনামলের যেই বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ কর্তৃত্বপরায়ণতা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, তার ছাপ ক্রোয়েশিয়ায় এখন অবশিষ্ট আছে কেবল ফুটবল জগতে। স্থানীয় ফুটবল জগতের সবচেয়ে বড় কর্তৃত্বপরায়ণ ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি ছিলেন জাদ্রাভকো মামিচ। তিনি ছিলেন ডায়নামো জাগরেভ ক্লাবের প্রধান ও জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। ক্রোয়েশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট কোলিন্দা গ্রাবার-কিতারোভিচের নির্বাচনী প্রচারে অর্থের যোগান দিতে সহায়তা করেছিলেন মামিচ। ৬ই জুন মামিচকে একটি দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তিনি এখন প্রতিবেশী বসনিয়ায় পলাতক। একই মামলায় নাম আছে বর্তমান দলের দুই তারকারও: অধিনায়ক লুকা মদ্রিচ ও ডিফেন্ডার দেজান লভরেন। রাশিয়া থেকে দেশে ফিরলে মিথ্যা হলফনামা দেওয়ার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হবেন তারা।

ক্রোয়েশিয়ান ফুটবলের অন্ধকার দিক এখানেই শেষ নয়। ভক্তরা ‘মাতৃভূমির জন্য! প্রস্তুত হও!’ শ্লোগান দিয়ে আসছেন বহুদিন ধরে। শুনতে সাধারণ জাতীয়তাবাদী শ্লোগান মনে হলেও, এই বিশেষ শ্লোগানের সঙ্গে স¤পৃক্ততা ছিল দেশটির উসতাশা শাসকগোষ্ঠীর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার উসতাশা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটনের অভিযোগ সুবিদিত। অতীতেও বর্ণবাদের অভিযোগ উঠেছিল ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল ভক্তদের বিরুদ্ধে। নতুন এই শ্লোগানের ফলে ফিফার সাজার মুখোমুখি ক্রোয়েশিয়া দল।

তবে এই অন্ধকার দিক সত্ত্বেও, বিশ্বকাপ জিতলে নিশ্চিতভাবেই আনন্দে ফেটে পড়বে পুরো দেশ। ‘ঐতিহাসিক’ শব্দটি ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলে অতিব্যবহৃত একটি শব্দ। তবে সত্যিই যদি বিশ্বকাপ জেতে ক্রোয়েশিয়া, তাহলে এই শব্দের প্রয়োগ হবে যথার্থ।

ক্রোয়েশিয়ার জনসংখ্যা মাত্র ৪০ লাখ। ১৯৫০ সালে উরুগুয়ের বিশ্বকাপ জয়ের পর, এত কম জনসংখ্যার কোনো দেশ বিশ্বকাপ জেতেনি। কোনো ক্রীড়া পদক জয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে, তার হিসাব করাটা সহজ কাজ নয়। তবে এটা বলা যায় যে, ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপ জিতলে দেশটি বিশ্বজুড়ে যেই ইতিবাচক প্রচারণা পাবে, তা বছরের পর বছর ধরে চালানো জনসংযোগ প্রচারণার চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান হবে। ১২ই জুলাই দেশের পুরো মন্ত্রীসভা যে ফুটবল দলের জার্সি গায়ে বৈঠক করলেন, সেটা তাই খুব বিস্ময়কর কোনো খবর নয়।