আন্তর্জাতিক

নারীর গোপ,,নাঙ্গ ছেদন এবং আদালতের রায় !!

নারীর গোপনাঙ্গ ছেদন- সঙ্কোচের শৃঙ্খল ছিন্ন করে কিছু নারীর উত্তাল কণ্ঠে কেঁপে উঠল শীর্ষ আদালতের চৌকাঠ। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট রায় জানিয়েছে খাতনা প্রথার বিরুদ্ধে। শতশত বছর ধরে পশ্চাতপদ সমাজের নারীরা শিকার হয়ে আসছেন এই জঘন্য প্রথার।

কী এই খাতনা?

মামলাটির আইনজীবী সুনীতা বলছেন, অবোধ শৈশবের সুযোগে বিশ্বের আরও অন্তত তিরিশটি দেশের মতো ভারতেও দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের মধ্যে শিশুকন্যার ‘ক্লিটোরিস’ বা যৌনসুখের বাহক প্রত্যঙ্গটি কেটে দেওয়ার নিয়ম আছে।

এই ‘হারাম কি বোটি’ কিংবা ‘অপবিত্র মাংসপিণ্ড’ দূরীভূত হলে নারী হবে পবিত্র, বিয়ের জন্য আদর্শ! মা ঠাকুমা দিদিমার মতো কাছের মানুষের উপস্থিতিতেই মুল্লানি বা পেশাদার কাটিয়ের (যদিও এরা শল্যবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়) হাতে রক্তাক্ত হয় মেয়েরা।

সিংহভাগ মুসলিম সম্প্রদায় এই প্রথায় বিশ্বাস না করায় উপমহাদেশে মেয়েদের খতনা প্রচলিত নয়। তবে, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচের কিছু দেশে এই জঘন্য প্রথা এখনও জোরেশোরে চলছে।

ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০ বিলিয়নের বেশি মেয়ে এই যন্ত্রণা বয়ে চলছে তাদের শরীরে। পিতৃতন্ত্রের কালো হাত সমাজ, ধর্ম, এমনকি ঔপনিবেশিকতাবাদের অজুহাতে নারীর শারীরিক কিম্বা যৌন অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।

যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত আর ‘নিষ্কলুষ’ থাকার দায় একা নারীর! মধ্য প্রাচ্য, এশিয়া আর আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ ছাড়াও জার্মানি, ফ্রান্স, আমেরিকার মতো প্রথম বিশ্বের দেশেও এর হার কিন্তু উর্ধ্বগামী। বিশ্বজুড়ে আজ যখন এফজিএম বা ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশনের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার, প্রতিবাদ চলছে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় যেন তাতেই সামিল হল।

প্রমাণ হল, কিছুটা ‘অচ্ছে দিন’ হয়তো মেয়েদের জন্য আসছে। তবে শুনানি চলবে এখনও। শুধু আইনের দিকে না তাকিয়ে, লজ্জায় নুয়ে না গিয়ে গর্জে উঠতে হবে মেয়েদেরকেও। যে যোনি তাকে জননী করেছে, তার অধিকার রক্ষার লড়াই তো নারীর একান্ত কর্তব্য।

কোন মেয়েকে একটা চকলেট কিংবা সিনেমার লোভ দেখানো হয়। কিম্বা শুধুই বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার ছলনা। তারপর অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরটায় হাতুড়ে কারও হাতে নারীদেহের অমোঘ যৌনসুখের জায়গাটা, যেখানে জটলা করেছে হাজার নার্ভের প্রান্তভাগ, তাকে একটা ব্লেড বা ওরকম কিছু সাধারণ জিনিস দিয়ে এক ঝটকায় কেটে ফেলা হয়।

এই ক্লিটোরিসকে তারা বলে ‘অপবিত্র মাংসপিণ্ড’। এটি কেটে ফেললে নাকি নারী হবে পবিত্র, বিয়ের জন্য আদর্শ! তাই পরিবারের নারী সদস্যদের উপস্থিতিতে মুল্লানি বা পেশাদার কাটিয়ের (যদিও এরা শল্যবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়) হাতে রক্তাক্ত হয় ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুকন্যারা।

সাথে সাথে ফিনকি দিয়ে নেমে আসে রক্ত। অসহনীয় যন্ত্রণায় কাতারাতে হয় মেয়েটিকে। আর সংক্রমণের যন্ত্রণা তো অবশ্যম্ভাবী। বিয়ের বয়স হওয়ার পর যৌনসুখ বুঝতে না পেরে শুধুই ধর্ষিত হয় সেই নারী। এর থেকে তৈরি হয় মানসিক অবসাদ। জাতিসংঘ অনেক আগেই এই জঘন্য প্রথাকে ‘মানবতার লংঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ভারতের মাসুমা রানালভির মতো যারা নিজেরাই এই ভয়ানক প্রথার শিকার হয়েছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি তুলেছেন প্রথাটি বন্ধ করার। যেহেতু বেশিরভাগ মুসলিম এই খাতনা বা সুন্নতের রীতি মেনে চলেন না, তাই ধর্মের অজুহাত টিকবে না।

তাছাড়া শৈশবেই মেয়েদের গোপনাঙ্গকে ক্ষতবিক্ষত করে তার মানসিক যন্ত্রণা ছাড়াও যৌনজীবন, এমনকী সন্তান ধারণ পর্যন্ত প্রশ্নের মুখে তুলে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কালো হাত, ধর্মীয় অজুহাত এমনকী ঔপনিবেশিকতাবাদের অজুহাতে নারীর শারীরিক কিংবা যৌন অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। সব দায় যেন মেয়েদের শুধু একার!

বিশ্বজড়ে আজ যখন এফজিএম বা ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশনের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার, প্রতিবাদ চলছে, তখন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই রায় যেন নারী অধিকারের প্রতিধ্বনি তুলল। প্রমাণ হলো মেয়েদের জন্যও আসছে সুদিন।

আপনার মতামত