জাতীয়

নড়াইল-২ আসনে নৌকার প্রার্থী হচ্ছেন মাশরাফি!

নড়াইল-২ আসনে- নড়াইলের মাটি নৌকার ঘাটি বলে পরিচিত হলেও জোট গঠনের পর থেকে বেকায়দায় পড়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তাই নড়াইল-২ (লোহাগড়া উপজেলা ও সদরের একাংশ) আসনটি জোটকে এবার ছাড়তে নারাজ আওয়ামী লীগ।

জানা গেছে, গত নির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কোনো খোঁজখবর রাখেনি।

তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় শরিকদলকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে কাউকে দলীয় মনোনয়ন দিতে হবে। আর এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে নড়াইল-২ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে মনোনয়ন পেতে আরেকটি বিবেচনাধীন বড় বাধার নাম বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সফল ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। এ আসন থেকেই আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে।

মাশরাফি কি এবার নড়াইলের এমপি প্রার্থী হচ্ছেন? প্রধানমন্ত্রী তার জন্য দোয়া চাইলেন কেন? এমন প্রশ্ন নিয়ে নড়াইলের হাটে মাঠে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা। নড়াইল-২ আসনে মাশরাফি কী সত্যিই প্রার্থী হচ্ছেন এটি নিয়ে ভাবা শুরু করেছেন স্বয়ং আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থীরাও।

গত ৪ অক্টোবর দেশব্যাপী ৪র্থ উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লোহাগড়া উপজেলার সাথে ভিডিও কনফারেন্স করেন। সেখানে তিনি মাশরাফিকে নড়াইলের বড় সম্পদ উল্লেখ করে তার সুস্থ্যতার জন্য দোয়া চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর নড়াইলের সর্বত্র গুঞ্জন আরো বেগবান হয়েছে।

মাশরাফির সাথে রাজনীতি বিষয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন করা হলে তিনি কখনোই রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে আগ্রহ না দেখিয়ে বরাবরের মতো বলেন, আগে ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ খেলতে চাই, তারপর রাজনীতি। এছাড়া জনপ্রিয় এই ক্রিকেটারের ঘনিষ্ঠ আরো একটি সূত্র থেকে জানা যায়, এ মুহূর্তে রাজনীতিতে আসা বা নির্বাচন করতে তিনি মোটেও ইচ্ছুক নন।

গত ২৯ মে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল ঢাকার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় মাশরাফি ও সাকিবের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন,“মাশরাফি নির্বাচন করতে পারেন, করলে আপনারা ভোট দেবেন।

সেই ঘোষণার পর নড়াইলের নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন দেশসেরা ক্রিকেট তারকা মাশরাফি। তারপর থেকে নড়াইলের বাড়িতে গেলেই মাশরাফিকে ঘিরে ছাত্রলীগের একটি অংশ সার্বক্ষণিক ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা প্রার্থীরা মাশরাফিকে প্রতিদ্বন্ধী মনে করে বিভিন্ন তাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্তব্যও দিয়েছেন ইতোমধ্যে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করা হচ্ছে মাশরাফির বিরুদ্ধে। মাশরাফির নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সামাজিক কর্মকাণ্ডকেও তারা নির্বাচনে নামার প্রক্রিয়া মনে করে তাতে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন তারা।

তবে এলাকার যুবসমাজ বিষয়টিকে ইতিবাচক ভাবেই দেখছেন। এমপি হয়েও দলে খেলতে পারেন এমন মন্তব্য করে ক্যাপ্টেন ম্যাশের একজন ভক্ত বলেন, মাশরাফি এমপি হলে হয়তো সে মন্ত্রী হয়ে ক্রীড়ার উন্নয়ন ঘটাবে, নড়াইলও একজন মন্ত্রী পাবে, আমরা চাই সে এমপি হিসেবেই দলে নেতৃত্ব দিক।

স্থানীয়রা জানান, দেশের যুবসমাজের আইকন মাশরাফি নড়াইলে আসলে দলমত নির্বিশেষে সবার সাথেই চলাফেরা করেন, তার কাছে দলের চেয়ে ব্যক্তি সম্পর্ক অনেক বড়। বন্ধু বৎসল মাশরাফি কখনোই কোন দলের হয়ে কথা বলেননি।

নিজের খেলা আর এলাকার গরীব মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তিনি। তার পয়সায় দেশের বিভিন্ন চিকিৎসা এবং প্রকৌশলীতে পড়ালেখা করছেন মেধাবী ছাত্ররা। এলাকার মানুষের কাছে মাশরাফি দিনে দিনে একজন দেবতুল্য মানুষ হয়ে উঠেছেন।

মাশরাফির প্রতিবেশী বন্ধু ও প্রতিবেশী সূত্রে জানা গেছে, তার (মাশরাফি) কাছ থেকে ভালোবাসা কিংবা সহায়তা পাননি নড়াইলে এমন অসহায় মানুষের সংখ্যা বিরল। তাইতো তিনি আর্ত মানবতা ও ক্রীড়ার সেবায় গড়ে তুলেছেন নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন।

স্পন্সর জোগাড় করে ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবলের জন্য ৩ বছরের কোর্স করাচ্ছেন, স্পেশাল জিম তৈরির উদ্যোগও নিয়েছেন। দরিদ্র মানুষের জন্য অ্যাম্বুলেস, স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করেছেন, নিজের বিজ্ঞাপনের টাকা দিয়ে চলছে নড়াইল বাসীর সেবা। দলীয় বা সরকারি কোনো সহায়তা ছাড়াই তিনি একান্ত প্রচেষ্টায় করেন এসব সেবামূলক কার্যক্রম।

নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী বশিরুল হক বলেন, মাশরাফি তো কখনোই নির্বাচনে আসার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখায়নি, সে ইতিপূর্বে যেটা বলেছে সেটা হলো প্রধানমন্ত্রী যদি নির্বাচনের মাঠে নামতে বলেন তাহলে তাকে নামতে হতে পারে, মাশরাফি নির্বাচিত হলে বিশ্বকাপে আমাদের একজন এমপি খেলবে, এটাতো ভালই হবে।

নড়াইল-২ আসনের মনোনয়ন প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ আইয়ুব আলী জানান, মাশরাফি সবার উপরে, নেত্রী তাকে মনোনয়ন দিলে আমরা সবাই তার হয়েই ঝাপিয়ে পড়বো, কিন্তু আমার মনে হয় তিনি অসুস্থ তাই প্রধানমন্ত্রী তার জন্য দোয়া চেয়েছেন, এখানে নির্বাচনের কোন ইঙ্গিত নাই।

নির্বাচনে মাশরাফির প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে তার বাবা গোলাম মর্তুজা স্বপন বলেন, মাশরাফি কিংবা আমরা কখনোই নির্বাচন নিয়ে ভাবিনি। আমরা কোথাও আগ্রহ প্রকাশ করিনি। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি চায়, তার চাওয়া ফেরত দেয়াতো সম্ভব নয়, জানিনা মাশরাফি কি করবে।

নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নড়াইল-২ আসনের মনোনয়ন প্রার্থী নিজামউদ্দিন খান নিলু বলেন, প্রধানমন্ত্রী মাশরাফির অসুস্থতার কারণে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন, এখানে তার প্রার্থীতার ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত দেননি, এগুলো সবই অতি উৎসাহী লোকের গুজব।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরে এ ব্যাপারে মাশরাফি কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও বিষয়টি নড়াইলের সময়ের সবচেয়ে বহুলালোচিত বিষয়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রয়াত শরীফ খসরুজ্জামান ৫৯ হাজার ৫০৬ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মাত্র ৩২ হাজার ৫১৬ ভোট পান।

১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে প্রহসনের নির্বাচন আওয়ামীলীগ ও জামায়াত প্রত্যাখান করে। একই বছরে ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী খসরুজ্জামান ৬৩ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। নিকটতম বিএনপি প্রার্থী পান ৪২ হাজার ৭১৮ ভোট।

২০০১ সালে অষ্টম সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী হয়ে শেখ হাসিনা ৪ হাজার ১১৪ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হন। শেখ হাসিনা পান ৯৭ হাজার ১৯৫ ভোট। আর চারদলীয় জোট প্রার্থী মুফতি শহিদুল ইসলাম ৯৩ হাজার ৮১ ভোট পান।

শেখ হাসিনা আসনটি ছেড়ে দেয়ার পর উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট সোহরাব বিশ্বাস প্রার্থী হয়েও জোট সরকারের অধীনে কারচুপির আশঙ্কায় পরে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি পান মাত্র ২ হাজার ৫০৮ ভোট। এ ক্ষেত্রে মুফতি শহিদুল ইসলাম এক লাখ ৩৭ হাজার ৬৯৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এসকে আবু বাকের নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী শরীফ খসরুজ্জামানকে পরাজিত করে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরে দাঁড়ালে ১৪ দলীয় মহাজোটের প্রার্থী জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান জয়ী হন স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ্বাসকে পরাজিত করে।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে জোটের প্রার্থীরা তেমন একটা প্রচারে নেই। মনোনয়ন নিশ্চিত হলে তারা প্রচারে নামবে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন- জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া উপ-কমিটির সদস্য,

সমাজ সেবক শেখ মো. আমিনুর রহমান হিমু, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এস এম আসিফুর রহমান বাপ্পি, সাবেক সংসদ সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এসকে আবু বাকের, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ্বাস, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ আইয়ুব আলী।

নড়াইল-২ আসনের আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য শিল্পপতি শেখ মো. আমিনুর রহমান হিমু বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নীতি ও আদর্শকে বুকে ধারণ করে এলাকায় কাজ করে যাচ্ছি। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে দলীয় মনোনয়ন চাইব। মনোনয়ন পেলে নড়াইলকে একটি আধুনিক ডিজিটাল এলাকা হিসেবে গড়ে তুলবো।’

জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এস এম আসিফুর রহমান বাপ্পি বলেন, ‘গত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাকে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নেত্রীর নির্দেশে আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করলে শরিকদল ওয়ার্কার্স পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়। আমি দীর্ঘদিন যাবৎ দলের জন্য কাজ করছি। আশা করি প্রধানমন্ত্রী আমাকে দলীয় প্রতীক নৌকা দেবেন।’

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস বলেন, ‘শরিকদল ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমানকে বিগত নির্বাচনে দলের মনোনয়ন দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাদের নৌকা প্রতীকের পক্ষে কাজ করে জয়ী হন। গত পাঁচ বছর তিনি আমাদের দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখেননি।’

এছাড়া মহাজোটের প্রার্থী রয়েছেন- বর্তমান ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান, জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার ফায়েকুজ্জামান ফিরোজ।

বিএনপির দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন- জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহারিয়ার রিজভী জর্জ। দলীয় মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন তারা।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম জানান, দেশে অরাজকতা চলছে। এমন অবস্থায় দেশ চলতে পারে না। আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারপর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার বিষয়। দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আর তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয় তাহলে অবশ্যই জয়ী হবেন তিনি।

এদিকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন- এনপিপির কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান ডক্টর অ্যাডভোকেট ফরিদুজ্জামান ফরহাদ।

Source : Somoyer Konthosor

আপনার মতামত