সংবাদ | বিনোদন | সারাক্ষন

বোতলের পানি পান করার আগে জেনে নিন

বোতলের পানি – অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের বুন্ডানন শহর কর্তৃপক্ষ প্লাস্টিকের বোতলে ‘তথাকথিত’ পানির বিপণন চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বুন্ডাননবাসীর চাপে ব্যবসায়ীরাও প্লাস্টিকের বোতলে পানি বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেন। অন্যদিকে শহর কর্তৃপক্ষ বিপুল উদ্যমে এখন নিরাপদ ট্যাপের পানি সরবরাহ করছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্লাস্টিকের বোতলে সামান্য তাপ লাগলে পানিতে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যা মোটেও প্রাণির স্বাস্থ্যের উপযোগী নয়।

বিষয়টি নিয়ে গবেষণার অন্ত ছিল না। কিন্তু তথাকথিত মিনারেল ওয়াটারের নামে প্লাস্টিকের বোতলে ‘মানহীন’ পানির ব্যবসার পেছনে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ থাকায় বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোও তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে সাহসী হয় না।

আশার কথা হচ্ছে, গত বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের কনকর্ড শহর প্লাস্টিক বোতল-পানি নিষিদ্ধ করা হয়। সময়োপযুগী এ দৃষ্টান্তকে বিবেচনায় এনে এর দু মাস পরই দেশটির ওয়েস্টার্ন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি তার ক্যাম্পাসে প্লাস্টিক বোতল-পানি বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দেশটির এভারগ্রিন স্টেট কলেজ ও সিয়াটল ইউনিভার্সিটিও একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে। এ দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আশা করছেন, তাদের অনুসরণ করতে আমেরিকার হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে। পরিসংখ্যান মতে, মার্কিনীরা বছরে ৮৬০ কোটি গ্যালন প্লাস্টিক বোতল পানি বছরে পান করে।

নিত্য নতুন গবেষণায় বেরিয়ে আসছে, প্লাস্টিক বোতল-পানি কোনোমতেই নিরাপদ ট্যাপের পানির চেয়ে স্বাস্থ্যকর নয়, বরং ক্ষতির পরিমাণ তাতে অনেক বেশি। কারণ যেসব উপাদান দিয়ে প্লাস্টিক বোতল তৈরি হয়, তা পানিতে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান ছড়িয়ে দেয়, যা পানকারীর স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

প্লাস্টিক থেকে পানিতে ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক পদার্থকে বিজ্ঞানীরা মানবদেহের হরমোন বা প্রাণরস বিপর্যয়কারী উপাদান বলছেন। কারণ এসব রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহে ঢোকার পর হরমোনের স্বাভাবিক কাজে বাধা দেয়। পাশাপাশি মুটিয়ে যাওয়া, অকালে যৌবনের চিহ্ন দেহে ফুটে ওঠা, উর্বরতা বা সন্তান জন্মদানের হার কমে যাওয়া, স্তন ক্যান্সার, প্রোস্ট্রেট ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার, হাইপারঅ্যাকটিভ শিশু, অটিজম, হৃদরোগও এসব রাসায়নিক পদার্থের কারণে হচ্ছে বলে গবেষকরা দাবি করছেন।

বিজ্ঞানীরা এসব রাসায়নিক পদার্থের নাম দিয়েছেন ‘এন্ডোক্রাইন ডিজরাপ্টটার্স’। এন্ডোক্রাইন হচ্ছে দেহের এমন একটি গ্রন্থি যা থেকে নির্গত রস রক্তের মাধ্যমে আমাদের টিস্যুতে পৌঁছে। তারা বলেছেন, প্লাস্টিকের ক্ষতিকর উপাদান পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে দেহে ঢোকার পর তা প্রাকৃতিক এস্ট্রোজেনের মতই আচরণ করে। এতে দেহের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

এদিকে আমেরিকার ন্যাচারেল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিল চার বছর ধরে দেশটির এক হাজার ব্রান্ডের প্লাস্টিক বোতল-পানি নিয়ে গবেষণার পর সরকারকে জানিয়েছে, ‘এ পানি কোনো মতেই ট্যাপের পানির চেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ নয়।’

নানা ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে এসব তথাকথিত মিনারেল বা ড্রিংকিং ওয়াটারের বোতল তৈরি হয়। এসব প্লাস্টিকের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে পলিএথিলিন টেরেফথালেট বা পিইটি। এ প্লাস্টিক তৈরির মূল উপাদান হচ্ছে খনিজ তেল।

গবেষকরা বলেছেন, প্লাস্টিক বোতল-পানিতে যে মাত্রায় ক্লোরিন মেশানো হয়, তাতে পানির অপকারী ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াও মারা যায়। আর এটার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে, মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল বা অকার্যকর হয়ে যাওয়া।

গবেষকরা এটাও বলেছেন, গ্লাসের জন্য কাচ তৈরিকালে যে পরিমাণ ক্ষতিকর পদার্থ নির্গত হয়, সমপরিমাণ প্লাস্টিক তৈরিতে তার চেয়ে একশ গুণ বেশি ক্ষতিকর পদার্থ নির্গত হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে, এসব প্লাস্টিক মাটিতে মিশে যেতে হাজার বছর লাগে। এনআরডিসির গবেষকরা এটাও বলেছেন, পানিতে বিদ্যমান কিছু মাইক্রো-অর্গানিজম মানবস্বাস্থ্যের জন্য খুব একটা বিপজ্জনক নয়। কিন্তু প্লাস্টিকের বোতলে ঢোকানোর পর তা সত্যি বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে।

সম্প্রতি ডিসকভারি নিউজের একটি আর্টিকেলে দাবি করা হয়েছে, জার্মান বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন প্লাস্টিক বোতলে যে পিইটি নামের রাসায়নিক থাকে, তা পানিতে মিশে দেহে হরমোন বিঘ্নকারী ক্যামিকেলে পরিণত হয়। ফ্রাঙ্কফুর্টের গোথে ইউনিভার্সিটির ইকোটক্সিকোলজিস্ট ও শীর্ষ গবেষক মার্টিন ওয়েগনার বলেছেন, ‘প্লাস্টিকে যেসব রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, তার সব কটির ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও জানতেই পারেননি।’

ওয়েগনারের গবেষণার ফলের সমর্থনে নিউ ইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অব রোচেস্টার স্কুল অব মেডিসিন অ্যান্ড ডেন্টিস্ট্রির ইপিডোমিনোলজিস্ট শান্না সোয়ান বলেছেন, ‘আমরা তো এটাই দেখতে পাচ্ছি, প্লাস্টিক বোতলের কফিনে আরেকটি পেরেক ঠুকে দেয়া হচ্ছে।’

প্লাস্টিক বোতল আধুনিক সভ্যতায় ‘থ্রোঅ্যাওয়ে কালচার’ বা ছুঁড়ে ফেলার সংস্কৃতি চালু করেছে। আমরা এখন মিনারেল ওয়াটার পান করে বোতল ছুঁড়ে ফেলছি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের গবেষণা এটাই প্রমাণ করছে প্লাস্টিক বোতলও আমাদেরকে জীবন থেকে ছুঁড়ে ফেলছে অকালমৃত্যুর দরজার দিকে।

প্লাস্টিক বোতলের ক্ষতিকর দিকটিও মোটেও উপেক্ষার নয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মার্কিনীরা প্রতি বছর ২৯ বিলিয়ন পানির বোতল ডাস্টবিনে ফেলে। এ সংখ্যক বোতল বানাতে ১৫ লাখ ব্যারেল তেল লাগে, যা দিয়ে এক লাখ মোটর গাড়ি এক বছর চালানো যায়। আর ১৫ লাখ ব্যারেল তেল থেকে প্লাস্টিক বানাতে বায়ুতে মিশে ২৫ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড। এসব বোতল অপসারণ করতেও সরকারকে গুনতে হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ।

বিজ্ঞানীরা এটাও বলেছেন, প্লাস্টিক বোতল-পানি নিয়ে গুটি কয়েক গবেষণার মাধ্যমে হয়তো এ পৃথিবীকে রক্ষা করা যাবে না, কিন্তু রক্ষার সূচনা হয়ে গেছে।

মার্টিন ওয়েগনার বোতল-পানি নিয়ে তার দীর্ঘ গবেষণার পর উপসংহার টেনেছেন এভাবে: ‘প্লাস্টিক বোতল-পানি নিয়ে সব ধরনের গবেষণার পর আমি ট্যাপের পানি পান শুরু করেছি। আমি জানি ট্যাপের পানিতেও ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু তাতে বোতল-পানির মতো এস্ট্রোজেনিক যৌগ নেই।’ অন্যদিকে মার্কিন বিজ্ঞনীরা দাবি করেছেন ‘প্লাস্টিক বোতল-পানি আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিউনিসিপ্যালটির ট্যাপের পানির ফিল্টার সংস্করণ ছাড়া আর কিছু নয়’।

প্লাস্টিক বোতল-পানির বিশুদ্ধতা ও কথিত গুণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ার পরও কেন পানির ব্যবসা দিন দিন বাড়ছে, তা নিয়ে ‘থ্রার্স্ট’ নামে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানিয়েছেন অ্যালন ফ্লিটো এবং ডিবেরাহ কাউফমান। এতে তারা দেখিয়েছেন, পানি এখন কর্পোরেট জগতের কবজায়। বিশ্বের নানা প্রান্তের মিউনিসিপ্যালটি বেসরকারিকরণের কারণে তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতিতে কি ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা ডকুমেন্টারিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো পানিকে ‘মৌলিক মানবাধিকার’ আখ্যা দিয়ে কিভাবে আগ্রাসী কায়দায় ভূগর্ভস্থ পানির কপিরাইট কিনছে, তার প্রমাণও দিয়েছেন। এই দুই নির্মাতা পরে ‘থার্স্ট: ফাইটিং দি কর্পোরেট থেপ্ট অব আওয়ার ওয়াটার’ শিরোনামে পোনে তিনশো পৃষ্ঠার একটি গবেষণাধর্মী বইও প্রকাশ করেছেন।

Comments
লোড হচ্ছে...