স্বাস্থ্য

ভেবেছিলাম পাইলস নিয়েই কবরে যাব!

ভেবেছিলাম পাইলস – পাইলস বলতে মলদ্বারের আশপাশের রক্তনালী ফুলে ব্যথার সৃষ্টি হওয়াকে বোঝায়। এটি মলদ্বারের ভেতরে কিংবা বাইরেও হতে পারে। পাইলস হলে চুলকানি বা রক্তক্ষরণ হয়। লজ্জার কারণে অনেকে এ রোগের কথা প্রকাশ করেন না। এই রোগ নিয়ে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কারণ আমাদের দেশে অনেকেই পাইলস নিয়ে ভুল চিকিৎসার শিকার হন। এতে রোগীর স্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

পাইলসকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হেমরোয়েডস বলা হয়। মলদ্বারের নিচের অংশে এক ধরনের রক্তের গুচ্ছ- যেটা আঙ্গুরের মতো ফুলে যায়, ফলে মল ত্যাগ করলে বা মল ত্যাগ না করলেও সেখান থেকে প্রায়ই রক্তপাত হয়। এটিই হচ্ছে পাইলস।

কবির, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তারপরও তার যত আক্ষেপ ও অনুশোচনা। মনে হয় কোনো পাপ করেছি। নইলে আজ এভাবে একটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম কেন? কি সেই অনুশোচনা? কি সেই পাপ? আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও পাইলস হওয়াকে একটি গোপন রোগ হিসেবে মনে করেন।

কেউ কেউ বলেন, এটি কি কাউকে বলা যায়? আমার স্ত্রীও জানে না যে আমার পাইলস হয়েছে। মূল সমস্যা হল চিকিৎসকের কাছে এসে পাইলসের গোপন স্থানটি দেখাতে হবে এখানেই যত সমস্যা। অনেকেই এটিকে অশ্লীলতা হিসেবে ভাবেন। কারও হার্টে কোনো অসুবিধা হলে বা টনসিলে ব্যথা হলে যে কারও সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করেন অথচ পাইলসের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উল্টো।

আধুনিক এক যুবকের কথা বলছি। চেম্বারে ঢুকে প্রথমে তার সঙ্গী সবাইকে বাইরে যেতে বললেন তারপর স্ত্রীকেও। এরপর রুমে আমি এবং সেই যুবক রোগী। আমাকে অনুরোধ করলেন চেম্বারের পর্দাঘেরা অংশে যেতে। আমিও কিছু বারণ করছি না।

ভাবছি হয়ত তার গোপন কোনো রোগ বা যৌনরোগ আছে। আশ্চর্য হলাম তখন যখন রোগীটি খুবই বিব্রতভাবে আমাকে বললেন যে, স্যার আমার মলদ্বার দিয়ে রক্ত যায়। আমি খুবই বিব্রতকর অবস্থায় আছি। আমার স্ত্রীকেও জানাতে চাই না। দয়া করে আমাকে একটু চিকিৎসা দিন।

অন্য একজন রোগীর বয়স ৬০। হাউজিংয়ের অফিসার ছিলেন। বহু বছর পূর্বে ঢাকা শহরে এক হাতুড়ে চিকিৎসকের হাতে মলদ্বারে ইনজেকশন নিয়েছেন। পরে খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছেন যে, মলদ্বারে নাইট্রিক এসিড ইনজেকশন দেয়া হয়েছে।

ঐ ইনজেকশন দেয়ার পর মলদ্বারের আশপাশে মাংস পঁচে গিয়ে মলদ্বার এমনই সরু হয়েছে যে তিনি আর মলত্যাগ করতে পারেন না। সামান্য ছিদ্র দিয়ে সব সময় পায়খানা চুইয়ে পড়ে। ভিতরে সর্বদা তুলার প্যাড পরে থাকেন। তাকে বললাম যে, দেশে আইন রয়েছে, শরীরে এসিড দিলে তার সাজা হয় আপনি বিচার চান।

রোগীর উত্তর ছিল এরূপ, ‘স্যার বয়স হয়েছে মেয়ে জামাই আছে, নাতি আছে, সমাজে এটি জানাজানি হয়ে গেলে মুখ দেখাতে পারব না। তাই এ ঘটনা প্রকাশ করতে চাই না। আপনি দেখুন কিছু করতে পারেন কিনা’।

এ কারণে আমাদের দেশে পাইলসের হাতুড়ে চিকিৎসার এত প্রসার। প্রতিদিন মলদ্বারে হাতুড়ে অপচিকিৎসার জটিলতা নিয়ে রোগীরা আমাদের কাছে আসেন। যখন তিনি বুঝতে পারেন যে, অপচিকিৎসায় তার মলদ্বার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তখন লোকলজ্জার ভয়ে এবং নিজের বোকামীর কথা ভেবে কেউই হাতুড়ে ডাক্তারের বিচার চাইতে চান না।

সবারই একই কথা হাতুড়ে চিকিৎসার কুফল আমাদের জানা ছিল না এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার কারণে কেউই নিজের দুরবস্থার কথা পর্যন্ত প্রচার করতে চান না।

অনেকেই বলেন যে, স্যার আমার পাইলস অপারেশন হয়েছে শুনে সহকর্মীদের অনেকেই বলল যে, তারও বহুদিন যাবৎ এ সমস্যা আছে কিন্তু কাউকে দেখাননি। এ সব সহকর্মী আগে কখনও এ ব্যাপারে মুখ খোলেননি।

অনেক রোগী বিশেষত মহিলা রোগীরা বছরের পর বছর ভোগেন কিন্তু কাউকে দেখান না। শেষ পর্যন্ত যখন বয়স বেড়ে যায় ৬০-৭০ হয় তখন আর সহ্য করতে পারেন না। শরীরে অন্যান্য রোগ যেমন ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ইত্যাদি হয়েছে তখন ছেলে বা নাতি-পুতিদের নিয়ে আসেন এবং বলেন যে, দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ উনি কাউকে দেখাবেন না বলে জেদ ধরেছিলেন, এখন আর সহ্য করতে পারছেন না। এই ভোগান্তির মূল কারণ কুসংস্কার।

দেশের একজন নামকরা উপাচার্যের স্ত্রীর পাইলস হয়েছে বহু বছর যাবৎ। কিন্তু তিনি ডাক্তারকে দেখাবেন না। শেষে এমন অবস্থা যে পায়খানা না করলেও রক্ত যায়। তার কয়েক ছেলে-মেয়ে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার। শেষ পর্যন্ত তাকে দেখলাম এবং বললাম যে, বিনা অপারেশনে তিনি ভালো হবেন।

কিন্তু রোগী বিশ্বাস করলেন না। অতঃপর দু’বার তার রিংলাইগেশন পদ্ধতিতে বিনা অপারেশনে পাইলস চিকিৎসা করায় তিনি সম্পূর্ণ ভালো হন। এরপর তিনি মন্তব্য করলেন যে, ভেবেছিলাম পাইলস নিয়েই কবরে যাব এখন দেখলাম এত সহজে ভালো হওয়া যায়। কেন যে অযথা এত ভুগলাম।

মলদ্বারের প্রতিটি রোগ বিজ্ঞানসম্মত এবং এর প্রতিটি রোগই চিকিৎসায় সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়। বিশেষ করে পাইলস ৯০% বিনা অপারেশনে ভালো করা যায়।

লেখক : অধ্যাপক ডা. একেএম ফজলুল হক, মলদ্বার ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ।

আপনার মতামত