জাতীয়

মসজিদে হুজুরের কান্না, বন্ধ হয়ে গেলো মেলা!

মসজিদে হুজুরের কান্না- নামাজ না পড়ানোর হুমকি দিয়ে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বৈশাখী মেলা বন্ধ করেছেন এক মসজিদের ইমাম। তার নাম হাফেজ জয়নাল আবেদীন।

নামাজের আগে মসজিদে কান্না করে বক্তব্য দিয়ে মুসল্লিদের ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। এতে মেলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কিছু অতি উৎসাহী মুসল্লি মারমুখি হয়ে ওঠে। ঘটনাটি ঘটেছে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নে।

এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন স্থানীয়রা।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার ভাটরা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গত ২০-৩০ বছর ধরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। আশপাশের গ্রামসহ দূর-দুরান্ত থেকে মৌসুমে ব্যবসায়ীরা এতে অংশ নেয়। গত বছর সাত দিনব্যাপী এই মেলা বসেছিল। এতে নানা বয়সি মানুষের বিপুল সমাগম হয়।

একাধিক মুসল্লি ও স্থানীয়রা জানায়, কয়েকদিন ধরে বর্ষবরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সবাই। শুক্রবার জুমার নামাজের আগে ভাটরা বাজার জামে মসজিদের ইমাম জয়নাল আবেদীন মসজিদে মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বয়ান দেন।

বয়ানে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় আইন শরিয়াহ বিরোধী হলে তা মানা হবে না। মেলা ও বৈশাখ পালন হিন্দু ধর্মের সংস্কৃতি বহন করে। মেলায় নারী-পুরুষ অবাধে চলাফেরা করে। এ জন্য বিদ্যালয় মাঠে মেলা হতে দেয়া যাবে না।

একপর্যায়ে তিনি কান্নাকাটি করে মুসল্লিদের বলেন, আপনারা যদি বিদ্যালয় মাঠে মেলা করেন তাহলে আমি আর নামাজ পড়াবো না। এ সময় তিনি কান্না করে মুসল্লিদের কাছ থেকে সমর্থন আদায় করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইমামের নামাজ না পড়ানোর হুমকিতে ওই মাঠে আয়োজকরা শনিবার মেলা করেনি। মেলা পরিচালনা কমিটির লোকজন ইমামের ধর্মীয় উসকানিতে আতঙ্কিত হয়ে মেলা বন্ধ করে দেয়।

বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় শনিবার সকালে মাটির হাড়ি-পাতিল নিয়ে দূর-দুরান্ত থেকে কয়েকশ ব্যবসায়ী আসলেও দুপুর নাগাদ তারা ফিরে যায়।

ভাটরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় শনিবার তিনি যাননি। তবে ওই দিন মাঠে মেলা হয়নি। কী কারণে মেলা হয়নি তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। সেইসঙ্গে তিনি বলেন, আবার মেলা হবে। এর প্রস্তুতি চলছে।

ভাটরা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত বলেন, মসজিদে ইমাম সাহেব মুসল্লিদের ভুল বুঝিয়েছেন। মেলা আয়োজনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক ক্ষুব্ধ হন মুসল্লিরা। সেইসঙ্গে বিদ্যালয় মাঠে মেলা করা হলে নামাজ না পড়ানোর হমকি দেন ওই ইমাম।

ভাটরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জামাল মুকবুল বলেন, ইমাম সাহেব মসজিদে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে মেলা রুখে দিয়েছেন।

আমরা ছোটবেলা থেকেই এই বিদ্যালয়ের মাঠে মেলা দেখে আসছি। বিগত বছরগুলোতে আমাদের যেসব দলীয় নেতাকর্মী এটি পরিচালনা করেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি ইমামের উসকানির জন্যই মেলা হয়নি।

মেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ভাটরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন মিঠু বলেন, আমি অসুস্থ, ঢাকায় আছি। অন্য বছরগুলোতে ভালোভাবে মেলা করা হলেও এবার তা করা হয়নি। তবে আমরা ওই মাঠে দ্রুত মেলা বসাবো। এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।

জানতে চাইলে রামগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তোতা মিয়া বলেন, বিষয়টি কেউ আমাকে জানায়নি। তবে খোঁজখবর নেয়া হবে।

রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু ইউছুফ বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে অনুমতি ছাড়া কোথাও যেন কেউ মেলা বসাতে না পারে সেজন্য থানার ওসিকে আমি একটি চিঠি পাঠিয়েছি।

নিজেকে মুফতি দাবি করে ভাটরা বাজার জামে মসজিদের ইমাম জয়নাল আবেদীন বলেন, আমি মানুষকে মসজিদে বুঝিয়েছি। কান্না করেছি। আমার এ চেষ্টা ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে ধরেছে।

অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সতর্ক করেছেন। এজন্যই হয়তো মেলা হয়নি। এছাড়া রাষ্ট্রীয় আইন শরিয়াহ বিরোধী হলে তা মানা হবে না। লালসালু পরে হিন্দুরা বাংলা বর্ষ পালন করবে, সেখানে মুসলমানদের কী?

ভাটরা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, ঘটনাটি কেউ আমাকে জানায়নি। বর্ষবরণ ও মেলা বাঙালির ঐতিহ্য। এটি আমাদের প্রাণের উৎসব। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গ্রামীণ মেলা বন্ধ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মাইন উদ্দিন পাঠান বলেন, “সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মানবিক মানুষ ও সমাজ গঠনে মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাধীন চিন্তার প্রসারেও এর ভূমিকা অসীম। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সম্প্রতি মতলববাজরা ধর্মকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা গড়ে তুলেছে। এদের প্রতিরোধ করতে সচেতন ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে।”

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে সোমবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) অঞ্জন চন্দ্র পালের মোবাইল ফোনে কল দিলেও সাড়া মেলেনি

আপনার মতামত